Thursday, August 4, 2011

খোদাভীতির আলামত

আল্লাহর প্রতি ভয়ঃ শুদ্ধ ঈমানের লক্ষণ

ফেরেশতাদের মাঝে আল্লাহর ভয়


হযরত আদী বিন আরতাত (রাঃ) বর্ণনা করেছেন। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ সাত আকাশের ফেরেশতাগন যখন সৃষ্টি হয়েছেন, ঠিক তখন থেকেই তাঁরা সেজদায় নত হয়ে আছেন। এরপরেও তাঁরা আল্লাহর ভয়ে কাঁপছেন! তদুপরি তাঁরা যখন কেয়ামতের ময়দানে সেজদা থেকে তাদের মাথা উঠাবেন, তখন বলবেন, হে আল্লাহ! আমরা তোমার ইবাদতের হক আদায় করতে পারি নি।

জাহান্নামের ভয়

হযরত আবু মায়সারা রাদিয়াল্লাহু আনহু রাতের বেলা যখন শুবার যেতেন, তখন বলতেন, আফসোস! যদি আমার মা আমাকে জন্ম না দিতেন। এসব কথা শুনে তার স্ত্রী বলতেনঃ আপনি এসব কী বলছেন! আল্লাহ তো আপনাকে ঈমান ও ইসলামের মতো মহানেয়ামত দান করেছেন। তখন জবাবে তিনি বলতেনঃ তা তুমি সত্য বলেছ। এতে কোন সন্দেহ নেই। এই নেয়ামত অনেক বড় নেয়ামত। কিন্তু আমাদেরকে উদ্দেশ্য করে তো বলা হয়েছে, সকলকেই জাহান্নামের উপর দিয়ে অতিক্রম করতে হবে। কিন্তু একথা বলা হয়নি যে, জাহান্নামের উপরের পথ অতিক্রম করতে পারব কি পারব না!

খোদাভীতির আলামত

ইমাম ফকীহ আবুল লায়স সমরকন্দী (রহঃ) বলেছেনঃ আল্লাহর প্রতি ভয় থাকলে তা সাতটি জিনিসের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। যথাঃ

১। জিহ্বা। আল্লাহর প্রতি ভয় থাকলে জিহ্বা দ্বারা মিথ্যা বের হয় না, গীবত বা পরনিন্দা করা হয় না, চোগলখুরি করা হয় না, অনর্থক কথা-বার্তা বলা হয় না। বরং জিহ্বা থেকে তখন জিকির ও কুরআন তেলাওয়াত বের হয়।\

২। পেট। আল্লাহর ভয় থাকলে শুধুই হালাল খাবার খাওয়া হয়। হারাম খাবার থেকে বেঁচে থাকা হয়। হালাল খাবারও খাওয়া হয় প্রয়োজন পরিমাণই। এর বেশি নই।

৩। চোখ। আল্লাহর ভয় থাকলে চোখ হারাম কিছু দেখে না। হালাল যাও দেখে তা দেখে শিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্যে। আগ্রহ ও আকর্ষণের কারনে নয়।

৪। হাত। আল্লাহর ভয় থাকলে হাত দ্বারা আল্লাহপাকের অপছন্দনীয় কোন কাজ কিছুতেই করা হয় না। যা কিছু তখন হাত দ্বারা করা হয়, তা কেবল আল্লাহপাকের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যেই করা হয়।

৫। পা। আল্লাহর ভয় থাকলে তখন পা এমন কোন কাজের দিকে অগ্রসর হয় না, যা আল্লাহ তা'আলা অপছন্দ করেন। পক্ষান্তরে যে কাজে আল্লাহপাকের সন্তুষ্টি লাভ হবে সে কাজের দিকে পা দৌড়ে যায়।

৬। অন্তর। আল্লাহকে যে অন্তর ভয় করে, সেই অন্তরে হিংসা-বিদ্বেষ, ঘৃণা-শত্রুতা ইত্যাদি থাকতে পারে না। থাকে সেসবের স্থলে ভালবাসা-বন্ধুত্ব, সহানুভূতি-সহমর্মিতা এবং সম্মানবোধ।

৭। ইখলাস। আল্লাহকে যে ভয় করে, সে সবসময় ইখলাসকে খুঁজে বেড়ায়।আর ভয় করে, না জানি ইখলাস না থাকার কারণে আমার কোন আমল্টা নষ্ট হয়ে যায়। এমন মানুষদের উদ্দেশ্য করে আল-কুরয়ানে ইরশাদ হয়েছেঃ আখিরাতের মঙ্গল আপনার পালনকর্তা খোদাভীরুদের জন্যেই রেখেছেন।

ছয়টি বিশেষ গুণ

ছয়টি বিশেষ গুণ

হযরত আলী (রাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি নিজের মাঝে ছয়টি গুণ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে, সে জাহান্নাম থেকে বাঁচতে এবং জান্নাতে প্রবেশ করতে পূর্ণ চেষ্টা করেছে। যথাঃ

১। আল্লাহকে চিনে তাঁর ইবাদত বন্দেগীতে লেগে যাওয়া।

২। শয়তানকে চিনে তার বিরোধিতায় উঠে পড়ে লাগা যাওয়া।

৩। সত্যকে বোঝার পর তার অনুসরণে লেগে যাওয়া।

৪। বাতীলের হাকীকত বোঝার পর তা হতে সম্পূর্ণরুপে বেঁচে থাকা।

৫। দুনিয়াকে চেনার পর তা পরিত্যাগ করা। এবং

৬। আখিরাতের চিন্তায় ও তালাশে মগ্ন থাকা।

চার কাজে অন্তর কঠিন হয়ে পড়ে

চারটি কাজ অন্তরকে কঠিন করে তুলে। যথাঃ

এক-পেট ভরে খাওয়া। (উল্লেখ্য, হালাল খাদ্য পেট ভরে খেলেও অন্তর কঠিন হয়ে যায়। সুতরাং হারাম খাদ্যের বিষয়ে আর প্রশ্নই ওঠে না।)

দুই- মন্দ লোকের সাহচর্য।

তিন- অতীতে কৃত গোনাহসমূহের কথা ভুলে যাওয়া। এবং

চার- দুনিয়ার আশা আকাক্ষা বেড়ে যাওয়া।

প্রতিটি মুসলমানের জন্যে উচিত হলো, দুনিয়ার চিন্তা কম করা। লোভ আশা আকাক্ষা কম করা। এবং আখিরাতের চিন্তা বেশি করে করা। আখিরাতের কল্যাণের জন্যে বেশি বেশি বন্দেগি করা। কারণ একথা কেউ জানে না যে, তার মরন কবে আসবে। কখন তাকে চলে যেতে হবে মাতা-পিতা, স্ত্রী-পুত্র এবং আত্নীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের পাশাপাশি অর্থ সম্পদ সহ আরো কত কিছুর মায়াজাল ছিন্ন করে।

চারটি কাজ ছাড়া চারটি বিষয় দাবী করা অর্থহীন

চারটি ছাড়া চারটি বিষয়ের দাবি করা অর্থহীন

হযরত হাতেম যাহেদ (রহঃ) বলেন, যে ব্যক্তি চারটি কাজ না করে অপর চারতি বিষয়ের দাবি করে সে মিথ্যুক। যথাঃ

১। আল্লাহপাকের ভালবাসার দাবি করবে। কিন্তু তা পক্ষ থেকে হারাম কৃত কাজগুলো বর্জন করবে না।

২। জান্নাতকে ভালবাসার দাবি করবে, অথচ জান্নাত পাবার জন্যে চেষ্টা ফিকির করবে না। করবে না আল্লাহপাকের আনুগত্যও। তাহলে তার এই ভালবাসার দাবি মিথ্যা।

৩। নবীপ্রেমের দাবি করবে। কিন্তু তার চালচলন সম্পূর্ণই নববী আদর্শের পরিপন্থী হবে। এমন অবস্থায় তার নবীপ্রেমের দাবি শুধুই মিথ্যা বলে গন্য হবে।

৪। জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা লাভের আশা করবে। কিন্তু সে গরীব দুঃখী অসহায় মানুষকে ভালবাসবে না, দূরে থাকবে তাদের সাহচর্য থেকে। তাহলে তার এই আশা করাটাও বিফলেই যাবে।

চারটি হাদীস

চারটি হাদীস

১। দুটি ক্ষুধার্ত নেকড়ে বাঘকে ছাগলের পালে ছেরে দেয়া হলে ছাগপালের জন্যে এই নেকরে বাঘ দুটি ততটুকু বিপজ্জনক বলে গণ্য হবে না, যতটুকু বিপজ্জনক হবে দ্বীনের জন্যে সম্পদ ও পদের লোভ। সূত্রঃ তিরমিযী শরীফ।

২। মানুষ একদিকে বুড়ো হতে থাকে, আর যুবক হতে থাকে তার মাঝে দুটি জিনিস। এর একটি হলো সম্পদ। দ্বিতীয়টি হল, দীর্ঘ জীবনের লোভ। সুত্রঃ বুখারী শরীফ।

৩। বুড়ো মানুষের হৃদয়মাঝে দুটি জিনিস সবসময় যুবক থাকে। এর একটি হলো, দুনিয়ার প্রতি ভালবাসা। আর দ্বিতীয়টি হলো, দীর্ঘ আকাক্ষা। সুত্রঃ বুখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফ।

৪। যার বয়স আল্লাহপাক ষাট বছর পূর্ণ করে দিয়াছেন, তার কোন ওযর-আপত্তি তিনি কবুল করবেন না।

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ যৌবনকালে মানুষ মনে করে, বার্ধক্য এখনো অনেক দূরে। বার্ধক্য দেখা দিলে তাওবা করে নিব। যে ব্যক্তি ষাট বছর বয়সে পৌছে গেল, তার জন্যে ওযর আপত্তি পেশ করার আর কোন অবকাশ রইল না। সুতরাং সে আর তাওবা করাকে বিলম্ব করতে পারে না। এখন তার জন্যে উচিত হলো, এখনই তাওবা করা।

Wednesday, July 27, 2011

ছালাম দেওয়া প্রসঙ্গে

নিম্নলিখিত লোকদেরকে ছালাম দেওয়া মাকরুহ

(১) নামায পড়া অবস্থায়, (২) কোরআন শরীফ তেলাওয়াত করা অবস্থায়, (৩) ইলেম শিক্ষাদানকারী ও গ্রহণকারীকে যখন তাহারা শিক্ষাদান ও শিক্ষা গ্রহনের কাজে থাকে, (৪) খুৎবা ও হাদীস পাঠ কালে, (৫) হাদীস, খুৎবা, কোরআন ওয়াজ শ্রবণকারীকে, (৬) আজান একামত দেওয়ার সময়, (৭) গায়রে মাহরেম যুবতীকে, (৮) বেদ্বীনকে, (৯) ফাছেককে, (১০) খেলাধুলা ও শরীয়ত বিরোধী কার্যে রত ব্যক্তিকে, (১১) স্ত্রীর সাথে কথোপকথন কালে অপর লোকের, (১২) উলঙ্গ ব্যক্তিকে, (১৩) পায়খানা পেশাবের অবস্থায় থাকা কালে, (১৪) অতি ক্ষুধার্ত ব্যক্তিকে খানা খাওয়া অবস্থায়, (১৫) বেদায়াতী ও কবিরা গুনাহকারীকে তওবা করিবার পূর্বে ছালাম দেওয়া জায়েয নাই।

Tuesday, July 26, 2011

আমাদের আমলের হিসাব করি

নিজেদের আমলের হিসাব করা দরকার

পাঁচ প্রকারের আমলের সমষ্টিই হলো প্রকৃত ইসলামী জীবন ব্যবস্থা-

১। আকায়েদ/আকীদা বিশ্বাস দুরস্ত হতে হবে।

২। ইবাদত-নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদি দুরস্ত হতে হবে।

৩। মোয়ামেলাত- বেচাকেনা হালাল তরিকায় হতে হবে। রুজি রোজগার হালাল তরিকায় হতে হবে, কোন প্রকারের আমদানী যেন হারাম না হয়।

৪। মোয়াশারাত- তথা পরস্পর আচার ব্যবহার চলাফেরা, উঠা-বসা, থাকা খাওয়া সবকিছু আল্লাহর হুকুম ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুকরণে হতে হবে।

৫। আখলাক অর্থাৎ মানুষের আখলাক দুরস্ত হতে হবে। মন্দস্বভাব-যেমন হিংসা, অহংকার, পরশ্রীকাতরতা, শত্রুতা ইত্যাদি মন্দস্বভাব নিজের মাঝে থাকতে পারবে না। ভাল স্বভাব নিজের মধ্যে তৈরী করতে হবে। যেমন বিনয়, তাওয়াক্কুল, শোকর ও ছবর ইত্যাদি ভাল স্বভাব নিজের মাঝে আনতে হবে।

উপরোক্ত পাঁচটি দিকের উপর যখন মানুষ যথাযথ আমল করে তখন তার দ্বীন পূর্ণ হয়। তখন সে ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে পূর্ণ মুসলমান হয়। প্রত্যেকেই দ্বীনের এ পাঁচটি দিক সামনে রেখে স্বীয় জীবনের হিসাব নেই। যেমন আমার আকীদা ঠিক আছে কিনা? আমার জিম্মায় পাঁচ ওয়াক্ত নামায জামাতের সাথে পড়া জরুরি, আমি এর কতটুকু আদায় করছি আর কতটুকু ছেড়ে দিয়েছি। আমার আমদানী হালালভাবে হচ্ছে না হারাম উপায়ে হচ্ছে? বাজারে যখন আমি কাজ কারবার করি তখন আমার কারবার দুরস্ত হয় কিনা? আমার আখলাক ঠিক আছে কিনা? অন্যের সাথে আমার ব্যবহার ঠিক আছে কিনা? আমি মিথ্যা বলি কিনা? আমি কারও গীবত করি কিনা? আমি অন্যের অন্তরে কষ্ট দেয় কিনা? আমি অন্যকে পেরেশান করি কিনা? এসব কাজের আমি হিসাব করবো। যদি কোথাও খারাবী থাকে তাহলে তা দূর করার চেষ্টা করব। যদি একেবারে না ছাড়তে না পারি তাহলে অন্ততপক্ষে কমাতে চেষ্টা করব। যেমন আমি দৈনিক কতবার মিথ্যা বলি। এখন আমি চিন্তা করবো আজ থেকেই আমি কতবার মিথ্যা বলা ছাড়তে পারি, তৎক্ষণাৎ তা ছেড়ে দিব। মজলিসে বসে আমি কতবার অন্যের গীবত করি এটা কতটুকু পর্যন্ত, এখনি যদি ছাড়তে পারি তা ছেড়ে দিব। এমনিভাবে হিসাব নিয়ে আজ থেকে গুনাহ ছাড়তে শুরু করুন এবং নিজের ইসলাহের ফিকির অন্তরে সৃষ্টি করুন। যদি একবার সংশোধনের চিন্তার আলো তোমার অন্তরে জ্বলে ওঠে তাহলে ইনশাআল্লাহ আল্লাহ তা'আলা এ আলো তোমার জীবনকে আলোকিত করে ছাড়বে। আল্লাহ আমাদেরকে সকলকে নিজ আমলের হিসাব নিয়ে নিজেকে সংশোধন করার সুযোগ করে দিন। আমীন! আমীন!!